বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে চিরবিদায় নিয়েছেন জননন্দিত এই নেতা। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক ও মর্মবেদনা।
রাজনীতির পথ কখনোই মসৃণ ছিল না খালেদা জিয়ার জন্য। মামলা–মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে স্বামী ও সন্তান হারানোর গভীর বেদনা এবং দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার পর দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন তিনি। আত্মগোপনে থেকে সেই ভয়াবহ সময় পার করেছেন একাকী ও দৃঢ় মনোবলে।
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭ দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার অঙ্গীকার রক্ষা করায় তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে ‘এরশাদ হটাও’ একদফা আন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন অগ্রণী নেতৃত্ব।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। শৈশব থেকেই পরিচ্ছন্নতা, পরিমিত জীবনযাপন ও সৌন্দর্যবোধের জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই পুত্র—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর অকাল বৈধব্য বরণ করেন খালেদা জিয়া।
১৯৮২ সালে বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। ধাপে ধাপে ভাইস চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। প্রায় চার দশকের বেশি সময় তিনি দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দেন।
দীর্ঘ আন্দোলন–সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। তিনি তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী এবং দুই দফায় বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে যেমন রাজনৈতিক সাফল্য ছিল, তেমনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনাও ছিল।
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁকে একাধিকবার গৃহবন্দী ও কারাবন্দী থাকতে হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাবাসের পর ২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে চলতি বছর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তিনি। তবে নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।
‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান হলো। সংগ্রাম, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বে ভর করে গড়ে ওঠা তাঁর জীবনগাথা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
